শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

শিরোনামহীন সিরিজ-৫

 

আমাদের মেয়েদের কপালে আঁকা চাঁদ সূর্য 

আমাদের গালে গোধূলি আলো

আমাদের গ্রহণের কাল ফুরসত পেলেই পাত পেতে বসে

সারাদিন এই সমস্ত জঙ্গল পেরোতে পেরোতে নতুন নতুন গল্প জমে যায়

রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হলো সারা

ধনে এলো মানে এলো

প্রাণেতে এলো না কেউ....//

১১/৮/২১

শিরোনামহীন সিরিজ-৪

 

সারাদিন 

দিনের পর দিন

একে একে চারশত একাশিটি রজনী পার করে সুলতানের বুকে জেগে ওঠে ঘোর

জোনাক জ্বলছে বসরার বাগানে

আলো হাতে কাফ্রি এক দাঁড়িয়ে তিলোত্তমা শাহজাদীর অপেক্ষায়

রাত নেমেছে ঘনঘোর 

মদিরায় বর্ষণ মুখর হাস্যরস

কনিষ্ঠ আঙুলের কাটা রক্তে ভেসে যায় দানিয়ুব.....

১১/৮/২১

শিরোনামহীন সিরিজ-৩



 আমরা যেন কি জানি কি জানি ভাবি সারাদিন

আমাদের নাই কোন ডানা

অনেকে বলেছে আমাদের উড়তে কেবলই মানা

আমাদের নাই কোন পোস্টঅফিস

অনেকে বলেনি দপ্তরবিহীন প্রেমিক পুরুষ সমান পাঙাশ মাছ

বলেনি পাঙাশ মাছের ঝোল খায় না ছেলে বুড়ো 

কি কাণ্ড দেখো! 

ছেলেরা খাচ্ছে কাতারে কাতারে মাংসের কালিয়া কাবাব ফিরনি

যদিও এলাকার ছোট ভাইরা খায় ফ্রি

'প্রচারেই প্রসার'- সিলি সিলি বাণী কপচায় রাঁধুনি আলাদীন

জ্বীনের বাদশাহ আসবেন মাঝরাতে জানা কথা 

খাবেন তস্তরি ভরে গোলাপ বেলি চামেলি

সেসবের বন্দোবস্ত কি করে হবে?!

 ঘামতে ঘামতে পাড়ায় পাড়ায় চক্কর দেয় আলীকদম

কদমে কদমে ছেয়ে গেলে রাজসিক সভা

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ঘানি ভাঙে দোয়েল শালিক

'দোষের ভাগ দাও দশের ঘরে ঘরে'--- মন্ত্র ঝেড়ে উড়ে যায় দাঁড়কাক।।

১১/৮/২১

শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

Book Review of Haruki Murakami's Novella 'Hear the wind sing'

 

মাত্র দুটি বই পড়ে বিশ্বখ্যাত একজন লেখককে অনুভব করতে পারা কঠিন শুধু নয় প্রায় অসম্ভব। তাই সে চেষ্টা আমি একেবারেই করব না। হারুকি মুরাকামির মত লেখক যার গল্পের ভেতরে গল্প তার ভেতরে গল্প....সে সব গল্পেরও আবার নানারকম বাঁক এবং বাস্তবতা। এরকম সাহিত্যকর্ম এবং তার স্রষ্টাকে বুঝতে পারা সহজ নয় (আমার মত অতিরিক্ত সাধারণ পাঠকের পক্ষে!)। নরওয়েজিয়ান উড যখন পড়েছি তখন একটা ধাক্কার মত খেয়েছিলাম। মূল গল্পের ভেতরের গল্প গুলো ছিল একেবারেই অচেনা। যেটা বুঝতে পারছিলাম তার গল্পে বিষণ্ণতা একদম মৃত্যুর মত শীতল। প্রতিটি চরিত্র ভয়ানক একাকিত্বে একাকার অথচ প্রাত্যহিক জীবন যাপন খুব স্বাভাবিক। অন্তত খোলা চোখে তাই দেখা যায়। 

 নরওয়েজিয়ান উডের পর আর মুরাকামি পড়া হয়নি। দীর্ঘ বিরতি শুধু মুরাকামি পড়ায় নয় সামগ্রিক বই পড়াতেই ছিল। যেন গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলাম। কবিতা লিখেছি অল্পবিস্তর আর পাগলের মত শয়ে শয়ে কবিতা পড়েছি। কাজের বাইরের সময়টা ফেসবুকের নানান গ্রুপে উপস্থিতির সাড়া দিয়ে বেড়ানো ছাড়া আর কিছু করেছি বলে মনে পড়ে না। তারপর অনেক অনেক দিন বাদে আবার কেন জানি পাঠক সত্ত্বা জেগে উঠল এবং একের পর এক বই পড়া শুরু করে দিলাম। অবশেষে আমার ফেসবুকের কর্মকাণ্ড সীমিত করা গেল! এখন এখানে লিখতেও ভাল্লাগে না পড়তেও না। এরচেয়ে বই পড়া ভালো লাগে। আর আমার দিন রাত এখন এভাবেই যায়। বই পড়া আর মিউজিক শোনা। লিখতে এখন আর আমাকে দেখা যায় না বললেই চলে!

 (অবশ্য মনে রাখতে হবে দীর্ঘ বিরতি মানেই শেষ বিরতি নয়। লেখালেখি আমার রক্তে বহমান। একভাবে না একভাবে লিখবই। তাই খুব বেশি ভাবি না। এখন লিখি না কিন্তু লিখব। আজ কিংবা কাল। তবে লিখব যে সেটা সুনিশ্চিত!)

সে যাকগে। হারুকি প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এই উপন্যাস পড়ার আগে একটু হারুকিকে পড়ে নেয়া দরকার বলে মনে করেছি। তো সেইজন্য গুগলে সার্চ দিয়ে যা সামনে পেলাম পড়ে ফেললাম। এই যেমন -

হারুকি মুরাকামি জন্মেছেন জাপানের কিয়েটোতে। তার বাবা একজন জাপানি সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। পিতামহ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তিনি তার কৈশোর কাটিয়েছেন কোবে নামক বন্দর শহরে। যে শহরের আকাশে বাতাসে জ্যাজ মিউজিক বাজত। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গীতকে সাথে করে নিয়ে যাওয়া হাজারো নাবিক এবং পর্যটক কিশোর হারুকি মুরাকামির জীবনকে একজন প্রকৃত সঙ্গীত প্রেমিক করে দিতে পেরেছিল।  নাবিকদের বিক্রি করা নানান বই খুব সস্তায় পুরোনো বইয়ের দোকানে পাওয়া যেত তখন। আর সেসব বই তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় ইংরেজি ভাষার সাথে এবং ইংরেজি ভাষায় লেখায় সাহিত্যকর্মের সাথে। বিশ্বসাহিত্য এবং সঙ্গীতকে তিনি এমনভাবে বুকে ধারণ করেছেন যে তার সারাজীবনের লেখালেখি এর প্রভাববলয় থেকে আর বের হতে পারেনি। সেজন্যই হয়ত তার অনুবাদকর্মের সূচনা। বিশ্বসাহিত্যের অনেক নামকরা বই জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন নিজের মৌলিক লেখার পাশাপাশি। 

জাপানি সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে তার সাহিত্যকর্ম অনেকটা অনুবাদ গল্পের মত। সেখানে জাপান অনুপস্থিত। সকল গল্পের পটভূমি জাপানে হলেও জাপানি সংস্কৃতিকে তেমন দেখা যায় না বলে তাদের মতামত। বরং এক বিচিত্রতা পরিলক্ষিত হয়। পরাবাস্তবতা, কাল্পনিক ঘটনাবলী এবং মানুষের অবচেতন মনের ভেতরের বিচিত্র সব প্রাণীদের নানান কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যায়! তিনি এক চিরন্তন বিষণ্ণতার জগত নির্মাণ করেন তার গল্পে। মৃত্যু এবং অন্তহীন নিস্তব্ধ নিঃসঙ্গতা পাঠককে এমন এক দেয়ালের মুখোমুখি করে দেয় যার ব্যপ্তি এবং উচ্চতা অজানা। 

 তিনি প্রতি দশ বছর অন্তর অন্তর তাঁর লেখার প্যাটার্ন চেঞ্জ করেন যা তাঁকে একনিষ্ঠভাবে লেখালেখি চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা যোগায়। হারুকি মুরাকামি অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং যত্নশীল একজন লেখক। কোন উপন্যাস অথবা গল্প প্রকাশের আগে তিনি এতবার রিভিউ করেন যে সেটা প্রকাশনা সংস্থায় যাবার পর প্রুফ রিড করার কোন সুযোগ থাকে না! 

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ করেন। এখনও তিনি রাত ৯টায় ঘুমোতে যান। ভোর চারটায় উঠেন। একটানা লেখেন ৫/৬ ঘন্টা এবং প্রতিদিন দৌড়ান। কখনো বা সাঁতার কাটেন। ভোরের প্রকৃতি, গাছ, পাখি, সঙ্গীত তাঁকে ভীষণরকম  উজ্জীবিত করে। তিনি বলেন লেখালেখির জন্য তার এইরকম ডিসিপ্লিনড জীবনযাপন জরুরি।  

লেখালেখি শুরু করার আগের কয়েক বছর তিনি এবং তাঁর  স্ত্রী ইয়োকো মুরাকামি টোকিওতে একটি জ্যাজ ক্লাব চালাতেন। ২৯ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস 'হিয়ার দ্য উইন্ড সিং' লেখেন ১৯৭৮ এ। বইটি তিনি লেখেন তার রান্নাঘরের টেবলে বসে। তখন হারুকির ছিল প্রচন্ড খাটুনির জীবন। স্বামী স্ত্রী দুজন মিলে চালাতেন ক্লাবটা। প্রচন্ড পরিশ্রম করে ক্লাবটাকে তাঁরা দাঁড় করিয়েছিল। তো এই রকম সারাদিন ক্লাবে খাবার পানীয় বানিয়ে লোকজনকে পরিবেশন করে অবসর মিলত সেই একেবারে রাতে এবং এই সমস্ত কাজের ফাঁকে ফাঁকেই তিনি লিখে গেছেন। চার মাস মত সময় লেগেছে তার ভাবনাকে উপন্যাসে রুপ দিতে। এটি একটি ছোট উপন্যাস বা নভেলা। বইটি প্রকাশিত হবার দেড় বছর পরে 'Gunzu Literature Prize' পান যা তাকে একাধারে বিস্মিত এবং অনুপ্রাণিত করে লেখক জীবন শুরু করার জন্য। 

এবার মূল উপন্যাসে আসি। গল্পের নায়ক সামারের ছুটিতে তার জন্মশহর কোবে'তে অলস সময় কাটাচ্ছিল প্রিয় বন্ধু র‍্যাটের সাথে। তারা প্রতিদিন জে'র বারে বসে বিয়ার খেত এবং একটার পর একটা খেতেই থাকত (অবসেশন!)। র‍্যাট এক আজব ছেলে যার পড়াশোনা ভালো লাগে না। নিজে ধনী ঘরের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ধনীদের সে প্রবল ঘৃণা করত। অঢেল সম্পদ এবং কোন কিছু না করেও জীবন কাটিয়ে দেয়ার নিশ্চয়তাকে তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ বিষয়ের একটি মনে হত। এই গল্পের পাত্র পাত্রী এবং ঘটনাপ্রবাহ খুবই সীমিত (যেহেতু গল্পটি মাত্র ১৯ দিনের ঘটনাপ্রবাহ কেন্দ্রিক)। র‍্যাট, চায়নিজ বারটেন্ডার জে, নয় আঙুলের মেয়েটি, অতীতের মানুষেরা, কিছু চলমান গল্প, আগস্ট মাসের অসহ্য গরম আর গল্পের ভেতরের নানান গল্প। 

যেমন আমেরিকান কল্পকাহিনী লেখক ডেরেক হার্টফিল্ডের একটি গল্প (এই নামে কোন লেখক নেই বাস্তবে। গল্পটি মুলতঃ তিনিই লিখেছেন!) হারুকি বইয়ে উল্লেখ করেছেন। গল্পটা এরকম- 

একজন মহাকাশ পরিব্রাজক গেলেন মঙ্গলের অন্তহীন কুয়াগুলো দেখতে। কেননা খবরে বলা হচ্ছে লোকজন সেসব কুয়ায় যেয়ে আর ফেরত আসেনি। গল্পের নায়ক অসীম সাহসী এবং কৌতুহলী। আত্মহত্যা করার আগে সে ভাবল দেখাই যাক না কি আছে এসব কুয়ায়। তো সে কুয়ায় নামল এবং কুয়ার নিচে একটি সুরঙ্গ পথ আবিষ্কার করল। সেই পথের শেষ কোথায় দেখার জন্য সে হাঁটতে শুরু করল এবং অনুভব করতে শুরু করল কিছু একটা যেন তার ভেতরে পরিবর্তন ঘটে গেছে। নিজেকে বেশ উৎফুল্ল লাগল তার কাছে। এবং সে হাঁটতে থাকল। হাঁটতে হাঁটতে যুবকটি লক্ষ্য করল সে আর একটি কুয়ার তলায় এসে পৌঁছেছে এবং আবারও একটি সুরঙ্গ পথ। এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে একদিন সে আলোর দেখা পেল। সুরঙ্গ পথ দিয়ে মঙ্গলের অপর প্রান্তের এক কুয়ো থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে যুবকটি অবাক হয়ে ভাবল, 'এ কোথায় এলাম!' কিছুই বোধগম্য হ'ল না তার। হঠাৎই কে যেন কানে কানে বলল, সূর্যটা আর দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার বছর পরে বিস্ফোরিত হবে। যুবকের মনের ভেতরে এক ভয়াবহ হাহাকার তৈরি হয় এই কথায়। বাকিটা আর বলছি না। এটুকু পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়ে নেবেন। 

এই গল্পটা খুব সহজ সাবলীল ভাষায় বাংলায় অনুবাদ করেছেন চলচিত্র নির্মাতা, লেখক, অনুবাদক আলভী আহমেদ। এটা যে অনুবাদ বই একবারও মনে হয়নি। এত ভালো অনুবাদ হয়েছে। তার আরও বই পড়ার ইচ্ছা রাখি।

এই তো। আর কিছু বলার নাই। যারা পড়তে চান বইটি কিনে পড়ে নিয়েন। ভাল্লাগবে আশা করি। আমার তো বেশ ভালো লেগেছে বইটা। 

০১/০৯/২১


রুম নম্বর ৩১৫, একাডেমিক ভবন, ডুয়েট

 

৩১৫ নম্বর রুমে আমার ডুয়েট জীবনের সূচনা হয়েছিল। ৩১৫ নম্বর রুমে ডুয়েট জীবন শেষ হয়েছিল। এডমিশন টেস্টের দিন একরকম শূন্য অনুভূতি নিয়ে পরীক্ষার হলে বসে বসে আশেপাশের সবার নার্ভাসনেস দেখছিলাম। আমার প্যারালালে বসা এক হুজুর ঝড়ের গতিতে কলম হাতে নিয়ে দোয়া পড়ে যাচ্ছিল। এত দ্রুত ঠোঁট নড়ছিল যে ছেলেটা নিঃশ্বাস কি আদৌ নিচ্ছিল কি না ভাবছিলাম বসে বসে। প্রস্তুতির ঘণ্টা পড়ল। স্যাররা পেপার দেয়া শুরু করলেন। নিয়ম কানুন বলে দিলেন কয়েকবার। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নাম রোল নাম্বার লিখে বসে আছি। ফাইনাল ঘণ্টা পড়বে লিখতে শুরু করব। অবশেষে ঘণ্টা পড়ল এবং রেস শুরু হয়ে গেল। 

আমার মাথায় কি ছিল?! অক্লান্ত দিন রাত্রির পরিশ্রম, কম ঘুমানো, ফ্যাক্সের খাবার, শেয়ার করা রুম, দিস্তা দিস্তা নিউজ পেপার, শ'খানেক ফরমুলা, বিএল থেরেজা, ক্যালকুলাস, থেভেনিন থিউরেম, অংক না পারার কষ্ট, চান্স না পাওয়ার কষ্ট, অজস্র দিনের কান্না, অভিমান, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, ঝড়..................................... 

বৃষ্টির মত ঝরে পড়ছিল ৩১৫ নম্বর রুমে আমার চারপাশ ঘিরে। অবিরাম সে ঝমঝম শব্দে আশেপাশের মানুষজনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ... সব সব বিলুপ্ত হয়ে গেল আমার কাছে। আমার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে কি না আদৌ আমার জানা নাই। আমার মাথায় তখন এত এত শব্দ ছিল যে চান্স পাবো কি পাবো না এই সংশয় মাথায় রাখার মত কোন জায়গা খালি ছিল না। যেদিন রেজাল্ট হলো। আমি কিছু ফিল করি নাই। যে কণ্টকময় পথ পাড়ি দিয়ে ডুয়েটে গিয়েছিলাম। আমি সেই পথ পিছনে ফিরে ফিরে বার বার দেখছিলাম। মাথার ভেতরটা খরখরে শূন্য মাঠ যেন! আনন্দ সেদিন আমার লাগে নাই। সত্যি। খবরটা শুনে আম্মুকে শুধু বললাম, 'আম্মু আর আমাকে ফ্যাক্সের ওই গন্ধ ভাত খেতে হবে না।' আমার মা এই কথা শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকলো অনেকটা সময়। আমার একলা চলার সেই যে শুরু আজও অব্দি অবিরাম চলছে। 

৩১৫ নম্বর রুমের কত হাজারো স্মৃতি। সিটি, কুইজ, আবেদীন স্যারের ক্লাসে ভয়ে জমে বসে থাকা, মান্নান স্যারের ইংলিশ লেকচার শুনে কিছুই না বুঝে হা করে থাকা, রাজু স্যার, সাজ্জাদ স্যার, মাসুমা ম্যাডাম, সাথী ম্যাডামের ক্লাস। দুপুরের পরের ক্লাসগুলোতে ঘুম তাড়ানোর যুদ্ধ। বিরতিহীন পরীক্ষার চাপ.....আরও কত কি যে!  

ক্যাম্পাসের সোনাঝরা, রুপাঝরা, অগ্নিঝরা দিন গুলোতে একটা কাজ সবসময় করতাম। ৩১৫ নম্বর রুমে যেইখানে বসে আমি এডমিশন টেস্ট দিয়েছিলাম প্রায়ই সেই চেয়ার সেই টেবিলটা ছুঁয়ে দিতাম। আর যেদিন শেষ ক্লাস ছিল। সবার মাঝেই কেমন একটা ছন্নছাড়া ছুটি ছুটি ভাব আর আমি ভাবাবেগশূন্যতায় চুপচাপ ছিলাম। রুমটাকে মনে মনে বলছিলাম, 'অবশেষে বন্ধু যাবার সময় হ'ল।'

 সেইদিন আর ছুঁয়ে দেইনি ওই সীটটাকে। দূর থেকে শুধু বললাম, 'যাই কেমন!!' 

আজ এই রাত্রিবেলায় শরতের বাতাসে শিসের মতন হঠাৎই  ৩১৫ নম্বর রুম মাথার ভেতর ফিসফিস করে বলল, 'এই জুঁই! এই এই!!'

৯/৯/২১

Earworm - A bitter sweet story


একটা সময় এমন ছিল যে আমি গান খুব কম শুনতাম আর এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে যতক্ষণ জেগে থাকি গান শুনতে থাকি শুনতেই থাকি। বলতে গেলে সবটা সময় কানের মধ্যে হেডফোন থাকেই। এত এত গান শোনার ফলাফল earworm নামক যন্ত্রণার উৎপত্তি (অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো না)। এই সমস্যা অবশ্য আমার আজকের না। বহুদিনের সখ্যতা এই যন্ত্রণার সাথে। আজ সকালে এত খারাপ লাগছিল যে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে ভাবছিলাম এটা কি কোন রোগ? কি সমস্যা এটা? এত জ্বালায় কেন আমাকে? দেখি তো গুগল কি বলে!


sraboni jui


গুগল বলল - Earworm কোন পোকা না যা আমার ব্রেইনের মধ্যে হেঁটে বেড়াইতে পারে। তাহলে এটা কি?! এটা হ'ল কোন গানের অংশ বা সুর লুপ আকারে মাথার ভেতরে বাজতে থাকা এবং কন্টিনিউয়াস যন্ত্রণা দিতে থাকা। এই সমস্যা তখনই হয় যখন আমরা একই গান বার বার শুনি। সেই গান গুলিই আমাদের মাথায় ঢুকে এই যন্ত্রণাটা দেয় যেগুলোর সুর খুব আকর্ষণীয় এবং সহজেই শিখে ফেলা যায় বা গাওয়া যায়। যা শুনলে আমাদের ভালো লাগে, যা হয়ত আমাদের কোন পুরোনো স্মৃতিকে জাগিয়ে দেয়। এইধরনের গানগুলোই Earworm এর জন্ম দেয়।

শুধু যে নস্টালজিক করে তা না কারো যদি মাইগ্রেইন থাকে বা obsessive Compulsive Disorder কিংবা epilepsy থাকে। যদি খুব বেশি Stress, anxiety or depression থাকে বা ঘুম ঠিকঠাক না হয় তবে এই আপাত নিরীহ সমস্যাটা খুব কষ্ট দিতে পারে। earworm ইনসমনিয়াকে ডেকে নিয়ে আসে দাওয়াত দিয়ে। আবার যারা বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভোগে যেমন সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার ওরাও এই সমস্যাটার মুখোমুখি হয়।

মূলতঃ কি হয়?

আমাদের ব্রেইন Auditory cortex এ Gap fill up করে মাথার ভেতর আজাইরা ঘুরতে থাকা পছন্দের কোন গানের অংশ বা সুর দিয়ে। auditory cortex হচ্ছে first hearing station আমাদের ব্রেইনের যা Temporal lobe এ অবস্থান করে। টেকনিক্যাল ডিটেইলস যারা এই বিষয়ে পড়াশোনা করে তারা বলতে পারবে আর যারা এর কার্যকারিতা জানতে চান নিজ উদ্যোগে জেনে নিন। তো এই অংশেই মূলতঃ earworm তার কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে এবং একটা phonological loop এর মধ্যে আটকে একই গান শোনাতে শোনাতে শোনাতে আমাদের পাগল বানায় ফেলে। সাধারণত কোন গানের অংশবিশেষই লুপ হয়ে যায় বা কোন সুর।

অবশ্য এই পোকার ব্যবসায়িক লাভ জনক একটা দিক আছে। এই যে ঘটনাটা ঘটে এটা যখন বণিক পাড়ার বুদ্ধিমান মার্কেটাররা জেনে গেল তখন তারা এক স্ট্র‍্যাটেজি বের করল। আমাদের ব্রেইনের যেইরকম সহজ এবং সুন্দর আকর্ষণীয় সুর পছন্দ সেই ধরনের সুর গুলো ব্যবহার করে জিঙ্গেল বানাতে লাগল এবং টিভি, রেডিওতে বেশি বেশি করে বাজাতে থাকল যাতে মানুষের এই earworm হয় আর ওই সমস্ত প্রোডাক্ট, সার্ভিস, অরগানাইজেশানের নাম যেন চাইলেও ভুলতে না পারে। অত্যন্ত সফল একটা মার্কেটিং স্ট্র‍্যাটেজি এটা। আমরা জানি টিভি/রেডিওতে এড দেয়াই হয় এই উদ্দেশ্য নিয়ে যাতে কাস্টোমার লক্ষ লক্ষ প্রোডাক্ট থাকা সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট ব্র‍্যান্ডের সাথে হুকড হতে পারে। আর সেটা সম্ভব হয় এই পোকা বাবাজির কল্যাণে। মনে আছে ছোটবেলায় কিভাবে বিভোর হয়ে এডের গান গাইতাম! আরসি কোলা, জনি প্রিন্ট শাড়ি, জুঁই তেল, গ্রামীণ ফোনের 'স্বপ্ন যাবে বাড়ি এবার'....ইত্যাদি ইত্যাদি (বাপরে! এখনো মনে আছে!)। এরকম গানগুলো আমাদের না চাইলেও মনে থাকে। আর আমাদের কাছে এই সমস্ত কোম্পানির প্রোডাক্ট কিন্তু ভালোই মনে হয়। একবার যদি কোন ব্র‍্যান্ডের সাথে কাস্টোমার হুকড করে দেয়া যায় তো আশা করা যায় প্রায় সারাজীবনই তারা ব্র‍্যান্ডের প্রতি লয়্যাল থাকবে। এটাই এড মার্কেটিং এর সফলতা।

যা হোক পোকার গল্পে ফিরে আসি। এখন তো জানলাম Earworm কি এবং বুঝলাম এটা কিভাবে জ্বালাযন্ত্রণা দিতে পারে। উপশমের উপায় কি কি?

উপায় হ'ল- ১. ঘুমাতে যাবার আগে গান না শোনা। একই গান রিপিটেডলি না শোনা। কেননা একই গান বারবার শুনতে শুনতে ব্রেইনে Zeigarnik effect ( কাজের মধ্যে বারবার interrupted হওয়া) তৈরি হয় যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে যায়।

২. যে গানটির অংশ মাথায় বাজছে তা পুরোটা শোনা। কিংবা অন্য কোন গান শোনা যেতে পারে যাতে ব্রেইন auditory cortex এর শূন্যতাকে অন্য কিছু দিয়ে পূরণ করতে পারে।

৩.খুব জোর চেষ্টা না চালানো পোকাটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার। তাহলে আরও বেশি কুটকুট করতে থাকবে।

৪. চুইং গাম চিবুনো। এতে চোয়ালের এক্সারসাইজ হয় এবং ব্রেইন এই লুপকে কাটতে পারে।

৫. জোরে বা আস্তে হাঁটা। মূল উদ্দেশ্য হ'ল যে লয়ে গান বাজছে তাকে বাধাগ্রস্ত করা। ধীরলয়ের গান হলে দ্রুত হাঁটতে হবে। দ্রুত লয়ের হলে আস্তে।

৬. সাধারণত কয়েক ঘন্টার মধ্যেই লুপ ছিঁড়ে যায়। কিন্তু যদি ২৪ ঘন্টার বেশি এই সমস্যা থাকে তবে ডাক্তার দেখাতে হবে মাথায় কোন ঝামেলা হচ্ছে কি না বোঝার জন্য।

তাই গান ভালোবাসুন গান শুনুন ঠিক আছে কিন্তু অতিরিক্ত শুনবেন না। বেশি মিষ্টি খেলে যেমন গলা জ্বলে তেমনই বেশি গান শুনলে earworm এর ঘুম ভাঙে আর খুশিতে আহ্লাদে একই গান শোনাতে শোনাতে পাগল বানায় ফেলে।

যা হোক বহু কষ্টে লুপ কেটে বের হতে পেরেছি আজকে! আলহামদুলিল্লাহ!

১৬/৯/২১

তথ্যসূত্রঃ হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল, কেনেডি সেন্টার, অক্সফোর্ড মেডিকেল স্কুল জার্নাল, উইকিপিডিয়া এবং গুগলের অন্যান্য এক্সপার্ট মামামামীরা।


মঙ্গলবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

শিরোনামহীন সিরিজ-২



ওতে কিছু যায় আসে না

কে বলেছে, কে বলেনি, সময়ের স্রোতে সবই যাবে ধুয়ে 

সত্যি, কে বেসেছে ভালো, কার হয়েছে মনটা কালো

আর কেই বা দেখেনি কোন আলো

ওতে কিছু যায় আসে না

নিক্তি তোমায় কেউ দেয়নি বুড়ো

অত কেন গুমোর কর?

পাল্লা মেপে হল্লা কর

মগজ বোঝাই শুধুই ধুলো

হাতে পায়ে শেকল পড়

ওতে কিছু যায় আসে না

দিন ফেরারি ঘর ফেরারি

মন ফেরারি তোমার

চোখের কাজল, মনের জলে ধুয়ে গেলে,

ঘুম ভাঙে না তোমার

তুমি একলা বড় 

একলা বড় 

একলা....

ওতে কিছু যায় আসে না 

বেগমবাজার

অলোকনাথ

বাবুপাড়া

ঘুরছো

তোমায় কেউ চেনেই না দেখছো?

ওহে! আয়নায় মুখ দেখো

তোমায় তুমি চিনতে পারো?

মানতে পারো, ভালোবাসতে পারো তো?

ওতে কিছু যায় আসে না

আঁশ বদলে মাস বদলে ঘর বদলে যাও

দিন বদলে মন বদলে দাও

ওতে কিছু যায় আসে না

কার নিক্তি কত বড়

কয় পাল্লায় মাপছে তোমায়?

ওসবে আদতেই কিছু যায় আসে না

কিচ্ছু যায় আসে না!


১৬/৮/২১

শিরোনামহীন সিরিজ-১

 

খণ্ড খণ্ড অতীতের মত সময় ফিরে গেছে আঙুর লতায়

মুখহীন মুখোশের মিলিত অভিমানে অভিযানে সৌখিন নখের বিশ্ব উল্টে ফেলে মোমদান।

কতবার আর প্রতিধ্বনি তোলো শরতের বাতাসে? 

কাকে ডেকে ডেকে দৌড়ে যাও বন প্রান্তর?

ভালোর পাশে বসে থাকো

কালোর পাশে বসে থাকো

হ্রস্বতম দিনের ছায়ায় ঘুমোও 

দ্রাঘিমান্তর অবলাল গোলাপে লেখো 

---পরানের গহীন ভিতর যে অন্ধকার, 

ওহে!চোখহীন দৃশ্যমানব, 

আলোর কিনারে যাও, আলেয়ার কিনারে যাও

মিনারে মিনারে ছড়িয়ে দাও--

সোম থেকে বুধ

মেঘমল্লারে গান বাঁধে যে বাউল

বসরার তোরণে তোরণে ঘোষণা করো 

তারই আগমন বার্তা----

'শখহীন নখহীন বিত্তহীনতার কবি 

তোমায় সেলাম'!!

৬/৯/২১

শিরোনামহীন সিরিজ-৫

  আমাদের মেয়েদের কপালে আঁকা চাঁদ সূর্য  আমাদের গালে গোধূলি আলো আমাদের গ্রহণের কাল ফুরসত পেলেই পাত পেতে বসে সারাদিন এই সমস্ত জঙ্গল পেরোতে পের...