৩১৫ নম্বর রুমে আমার ডুয়েট জীবনের সূচনা হয়েছিল। ৩১৫ নম্বর রুমে ডুয়েট জীবন শেষ হয়েছিল। এডমিশন টেস্টের দিন একরকম শূন্য অনুভূতি নিয়ে পরীক্ষার হলে বসে বসে আশেপাশের সবার নার্ভাসনেস দেখছিলাম। আমার প্যারালালে বসা এক হুজুর ঝড়ের গতিতে কলম হাতে নিয়ে দোয়া পড়ে যাচ্ছিল। এত দ্রুত ঠোঁট নড়ছিল যে ছেলেটা নিঃশ্বাস কি আদৌ নিচ্ছিল কি না ভাবছিলাম বসে বসে। প্রস্তুতির ঘণ্টা পড়ল। স্যাররা পেপার দেয়া শুরু করলেন। নিয়ম কানুন বলে দিলেন কয়েকবার। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নাম রোল নাম্বার লিখে বসে আছি। ফাইনাল ঘণ্টা পড়বে লিখতে শুরু করব। অবশেষে ঘণ্টা পড়ল এবং রেস শুরু হয়ে গেল।
আমার মাথায় কি ছিল?! অক্লান্ত দিন রাত্রির পরিশ্রম, কম ঘুমানো, ফ্যাক্সের খাবার, শেয়ার করা রুম, দিস্তা দিস্তা নিউজ পেপার, শ'খানেক ফরমুলা, বিএল থেরেজা, ক্যালকুলাস, থেভেনিন থিউরেম, অংক না পারার কষ্ট, চান্স না পাওয়ার কষ্ট, অজস্র দিনের কান্না, অভিমান, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, ঝড়.....................................
বৃষ্টির মত ঝরে পড়ছিল ৩১৫ নম্বর রুমে আমার চারপাশ ঘিরে। অবিরাম সে ঝমঝম শব্দে আশেপাশের মানুষজনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ... সব সব বিলুপ্ত হয়ে গেল আমার কাছে। আমার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে কি না আদৌ আমার জানা নাই। আমার মাথায় তখন এত এত শব্দ ছিল যে চান্স পাবো কি পাবো না এই সংশয় মাথায় রাখার মত কোন জায়গা খালি ছিল না। যেদিন রেজাল্ট হলো। আমি কিছু ফিল করি নাই। যে কণ্টকময় পথ পাড়ি দিয়ে ডুয়েটে গিয়েছিলাম। আমি সেই পথ পিছনে ফিরে ফিরে বার বার দেখছিলাম। মাথার ভেতরটা খরখরে শূন্য মাঠ যেন! আনন্দ সেদিন আমার লাগে নাই। সত্যি। খবরটা শুনে আম্মুকে শুধু বললাম, 'আম্মু আর আমাকে ফ্যাক্সের ওই গন্ধ ভাত খেতে হবে না।' আমার মা এই কথা শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকলো অনেকটা সময়। আমার একলা চলার সেই যে শুরু আজও অব্দি অবিরাম চলছে।
৩১৫ নম্বর রুমের কত হাজারো স্মৃতি। সিটি, কুইজ, আবেদীন স্যারের ক্লাসে ভয়ে জমে বসে থাকা, মান্নান স্যারের ইংলিশ লেকচার শুনে কিছুই না বুঝে হা করে থাকা, রাজু স্যার, সাজ্জাদ স্যার, মাসুমা ম্যাডাম, সাথী ম্যাডামের ক্লাস। দুপুরের পরের ক্লাসগুলোতে ঘুম তাড়ানোর যুদ্ধ। বিরতিহীন পরীক্ষার চাপ.....আরও কত কি যে!
ক্যাম্পাসের সোনাঝরা, রুপাঝরা, অগ্নিঝরা দিন গুলোতে একটা কাজ সবসময় করতাম। ৩১৫ নম্বর রুমে যেইখানে বসে আমি এডমিশন টেস্ট দিয়েছিলাম প্রায়ই সেই চেয়ার সেই টেবিলটা ছুঁয়ে দিতাম। আর যেদিন শেষ ক্লাস ছিল। সবার মাঝেই কেমন একটা ছন্নছাড়া ছুটি ছুটি ভাব আর আমি ভাবাবেগশূন্যতায় চুপচাপ ছিলাম। রুমটাকে মনে মনে বলছিলাম, 'অবশেষে বন্ধু যাবার সময় হ'ল।'
সেইদিন আর ছুঁয়ে দেইনি ওই সীটটাকে। দূর থেকে শুধু বললাম, 'যাই কেমন!!'
আজ এই রাত্রিবেলায় শরতের বাতাসে শিসের মতন হঠাৎই ৩১৫ নম্বর রুম মাথার ভেতর ফিসফিস করে বলল, 'এই জুঁই! এই এই!!'
৯/৯/২১
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন