Blog লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Blog লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

রুম নম্বর ৩১৫, একাডেমিক ভবন, ডুয়েট

 

৩১৫ নম্বর রুমে আমার ডুয়েট জীবনের সূচনা হয়েছিল। ৩১৫ নম্বর রুমে ডুয়েট জীবন শেষ হয়েছিল। এডমিশন টেস্টের দিন একরকম শূন্য অনুভূতি নিয়ে পরীক্ষার হলে বসে বসে আশেপাশের সবার নার্ভাসনেস দেখছিলাম। আমার প্যারালালে বসা এক হুজুর ঝড়ের গতিতে কলম হাতে নিয়ে দোয়া পড়ে যাচ্ছিল। এত দ্রুত ঠোঁট নড়ছিল যে ছেলেটা নিঃশ্বাস কি আদৌ নিচ্ছিল কি না ভাবছিলাম বসে বসে। প্রস্তুতির ঘণ্টা পড়ল। স্যাররা পেপার দেয়া শুরু করলেন। নিয়ম কানুন বলে দিলেন কয়েকবার। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নাম রোল নাম্বার লিখে বসে আছি। ফাইনাল ঘণ্টা পড়বে লিখতে শুরু করব। অবশেষে ঘণ্টা পড়ল এবং রেস শুরু হয়ে গেল। 

আমার মাথায় কি ছিল?! অক্লান্ত দিন রাত্রির পরিশ্রম, কম ঘুমানো, ফ্যাক্সের খাবার, শেয়ার করা রুম, দিস্তা দিস্তা নিউজ পেপার, শ'খানেক ফরমুলা, বিএল থেরেজা, ক্যালকুলাস, থেভেনিন থিউরেম, অংক না পারার কষ্ট, চান্স না পাওয়ার কষ্ট, অজস্র দিনের কান্না, অভিমান, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, ঝড়..................................... 

বৃষ্টির মত ঝরে পড়ছিল ৩১৫ নম্বর রুমে আমার চারপাশ ঘিরে। অবিরাম সে ঝমঝম শব্দে আশেপাশের মানুষজনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ... সব সব বিলুপ্ত হয়ে গেল আমার কাছে। আমার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে কি না আদৌ আমার জানা নাই। আমার মাথায় তখন এত এত শব্দ ছিল যে চান্স পাবো কি পাবো না এই সংশয় মাথায় রাখার মত কোন জায়গা খালি ছিল না। যেদিন রেজাল্ট হলো। আমি কিছু ফিল করি নাই। যে কণ্টকময় পথ পাড়ি দিয়ে ডুয়েটে গিয়েছিলাম। আমি সেই পথ পিছনে ফিরে ফিরে বার বার দেখছিলাম। মাথার ভেতরটা খরখরে শূন্য মাঠ যেন! আনন্দ সেদিন আমার লাগে নাই। সত্যি। খবরটা শুনে আম্মুকে শুধু বললাম, 'আম্মু আর আমাকে ফ্যাক্সের ওই গন্ধ ভাত খেতে হবে না।' আমার মা এই কথা শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকলো অনেকটা সময়। আমার একলা চলার সেই যে শুরু আজও অব্দি অবিরাম চলছে। 

৩১৫ নম্বর রুমের কত হাজারো স্মৃতি। সিটি, কুইজ, আবেদীন স্যারের ক্লাসে ভয়ে জমে বসে থাকা, মান্নান স্যারের ইংলিশ লেকচার শুনে কিছুই না বুঝে হা করে থাকা, রাজু স্যার, সাজ্জাদ স্যার, মাসুমা ম্যাডাম, সাথী ম্যাডামের ক্লাস। দুপুরের পরের ক্লাসগুলোতে ঘুম তাড়ানোর যুদ্ধ। বিরতিহীন পরীক্ষার চাপ.....আরও কত কি যে!  

ক্যাম্পাসের সোনাঝরা, রুপাঝরা, অগ্নিঝরা দিন গুলোতে একটা কাজ সবসময় করতাম। ৩১৫ নম্বর রুমে যেইখানে বসে আমি এডমিশন টেস্ট দিয়েছিলাম প্রায়ই সেই চেয়ার সেই টেবিলটা ছুঁয়ে দিতাম। আর যেদিন শেষ ক্লাস ছিল। সবার মাঝেই কেমন একটা ছন্নছাড়া ছুটি ছুটি ভাব আর আমি ভাবাবেগশূন্যতায় চুপচাপ ছিলাম। রুমটাকে মনে মনে বলছিলাম, 'অবশেষে বন্ধু যাবার সময় হ'ল।'

 সেইদিন আর ছুঁয়ে দেইনি ওই সীটটাকে। দূর থেকে শুধু বললাম, 'যাই কেমন!!' 

আজ এই রাত্রিবেলায় শরতের বাতাসে শিসের মতন হঠাৎই  ৩১৫ নম্বর রুম মাথার ভেতর ফিসফিস করে বলল, 'এই জুঁই! এই এই!!'

৯/৯/২১

Earworm - A bitter sweet story


একটা সময় এমন ছিল যে আমি গান খুব কম শুনতাম আর এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে যতক্ষণ জেগে থাকি গান শুনতে থাকি শুনতেই থাকি। বলতে গেলে সবটা সময় কানের মধ্যে হেডফোন থাকেই। এত এত গান শোনার ফলাফল earworm নামক যন্ত্রণার উৎপত্তি (অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো না)। এই সমস্যা অবশ্য আমার আজকের না। বহুদিনের সখ্যতা এই যন্ত্রণার সাথে। আজ সকালে এত খারাপ লাগছিল যে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে ভাবছিলাম এটা কি কোন রোগ? কি সমস্যা এটা? এত জ্বালায় কেন আমাকে? দেখি তো গুগল কি বলে!


sraboni jui


গুগল বলল - Earworm কোন পোকা না যা আমার ব্রেইনের মধ্যে হেঁটে বেড়াইতে পারে। তাহলে এটা কি?! এটা হ'ল কোন গানের অংশ বা সুর লুপ আকারে মাথার ভেতরে বাজতে থাকা এবং কন্টিনিউয়াস যন্ত্রণা দিতে থাকা। এই সমস্যা তখনই হয় যখন আমরা একই গান বার বার শুনি। সেই গান গুলিই আমাদের মাথায় ঢুকে এই যন্ত্রণাটা দেয় যেগুলোর সুর খুব আকর্ষণীয় এবং সহজেই শিখে ফেলা যায় বা গাওয়া যায়। যা শুনলে আমাদের ভালো লাগে, যা হয়ত আমাদের কোন পুরোনো স্মৃতিকে জাগিয়ে দেয়। এইধরনের গানগুলোই Earworm এর জন্ম দেয়।

শুধু যে নস্টালজিক করে তা না কারো যদি মাইগ্রেইন থাকে বা obsessive Compulsive Disorder কিংবা epilepsy থাকে। যদি খুব বেশি Stress, anxiety or depression থাকে বা ঘুম ঠিকঠাক না হয় তবে এই আপাত নিরীহ সমস্যাটা খুব কষ্ট দিতে পারে। earworm ইনসমনিয়াকে ডেকে নিয়ে আসে দাওয়াত দিয়ে। আবার যারা বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভোগে যেমন সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার ওরাও এই সমস্যাটার মুখোমুখি হয়।

মূলতঃ কি হয়?

আমাদের ব্রেইন Auditory cortex এ Gap fill up করে মাথার ভেতর আজাইরা ঘুরতে থাকা পছন্দের কোন গানের অংশ বা সুর দিয়ে। auditory cortex হচ্ছে first hearing station আমাদের ব্রেইনের যা Temporal lobe এ অবস্থান করে। টেকনিক্যাল ডিটেইলস যারা এই বিষয়ে পড়াশোনা করে তারা বলতে পারবে আর যারা এর কার্যকারিতা জানতে চান নিজ উদ্যোগে জেনে নিন। তো এই অংশেই মূলতঃ earworm তার কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে এবং একটা phonological loop এর মধ্যে আটকে একই গান শোনাতে শোনাতে শোনাতে আমাদের পাগল বানায় ফেলে। সাধারণত কোন গানের অংশবিশেষই লুপ হয়ে যায় বা কোন সুর।

অবশ্য এই পোকার ব্যবসায়িক লাভ জনক একটা দিক আছে। এই যে ঘটনাটা ঘটে এটা যখন বণিক পাড়ার বুদ্ধিমান মার্কেটাররা জেনে গেল তখন তারা এক স্ট্র‍্যাটেজি বের করল। আমাদের ব্রেইনের যেইরকম সহজ এবং সুন্দর আকর্ষণীয় সুর পছন্দ সেই ধরনের সুর গুলো ব্যবহার করে জিঙ্গেল বানাতে লাগল এবং টিভি, রেডিওতে বেশি বেশি করে বাজাতে থাকল যাতে মানুষের এই earworm হয় আর ওই সমস্ত প্রোডাক্ট, সার্ভিস, অরগানাইজেশানের নাম যেন চাইলেও ভুলতে না পারে। অত্যন্ত সফল একটা মার্কেটিং স্ট্র‍্যাটেজি এটা। আমরা জানি টিভি/রেডিওতে এড দেয়াই হয় এই উদ্দেশ্য নিয়ে যাতে কাস্টোমার লক্ষ লক্ষ প্রোডাক্ট থাকা সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট ব্র‍্যান্ডের সাথে হুকড হতে পারে। আর সেটা সম্ভব হয় এই পোকা বাবাজির কল্যাণে। মনে আছে ছোটবেলায় কিভাবে বিভোর হয়ে এডের গান গাইতাম! আরসি কোলা, জনি প্রিন্ট শাড়ি, জুঁই তেল, গ্রামীণ ফোনের 'স্বপ্ন যাবে বাড়ি এবার'....ইত্যাদি ইত্যাদি (বাপরে! এখনো মনে আছে!)। এরকম গানগুলো আমাদের না চাইলেও মনে থাকে। আর আমাদের কাছে এই সমস্ত কোম্পানির প্রোডাক্ট কিন্তু ভালোই মনে হয়। একবার যদি কোন ব্র‍্যান্ডের সাথে কাস্টোমার হুকড করে দেয়া যায় তো আশা করা যায় প্রায় সারাজীবনই তারা ব্র‍্যান্ডের প্রতি লয়্যাল থাকবে। এটাই এড মার্কেটিং এর সফলতা।

যা হোক পোকার গল্পে ফিরে আসি। এখন তো জানলাম Earworm কি এবং বুঝলাম এটা কিভাবে জ্বালাযন্ত্রণা দিতে পারে। উপশমের উপায় কি কি?

উপায় হ'ল- ১. ঘুমাতে যাবার আগে গান না শোনা। একই গান রিপিটেডলি না শোনা। কেননা একই গান বারবার শুনতে শুনতে ব্রেইনে Zeigarnik effect ( কাজের মধ্যে বারবার interrupted হওয়া) তৈরি হয় যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে যায়।

২. যে গানটির অংশ মাথায় বাজছে তা পুরোটা শোনা। কিংবা অন্য কোন গান শোনা যেতে পারে যাতে ব্রেইন auditory cortex এর শূন্যতাকে অন্য কিছু দিয়ে পূরণ করতে পারে।

৩.খুব জোর চেষ্টা না চালানো পোকাটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার। তাহলে আরও বেশি কুটকুট করতে থাকবে।

৪. চুইং গাম চিবুনো। এতে চোয়ালের এক্সারসাইজ হয় এবং ব্রেইন এই লুপকে কাটতে পারে।

৫. জোরে বা আস্তে হাঁটা। মূল উদ্দেশ্য হ'ল যে লয়ে গান বাজছে তাকে বাধাগ্রস্ত করা। ধীরলয়ের গান হলে দ্রুত হাঁটতে হবে। দ্রুত লয়ের হলে আস্তে।

৬. সাধারণত কয়েক ঘন্টার মধ্যেই লুপ ছিঁড়ে যায়। কিন্তু যদি ২৪ ঘন্টার বেশি এই সমস্যা থাকে তবে ডাক্তার দেখাতে হবে মাথায় কোন ঝামেলা হচ্ছে কি না বোঝার জন্য।

তাই গান ভালোবাসুন গান শুনুন ঠিক আছে কিন্তু অতিরিক্ত শুনবেন না। বেশি মিষ্টি খেলে যেমন গলা জ্বলে তেমনই বেশি গান শুনলে earworm এর ঘুম ভাঙে আর খুশিতে আহ্লাদে একই গান শোনাতে শোনাতে পাগল বানায় ফেলে।

যা হোক বহু কষ্টে লুপ কেটে বের হতে পেরেছি আজকে! আলহামদুলিল্লাহ!

১৬/৯/২১

তথ্যসূত্রঃ হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল, কেনেডি সেন্টার, অক্সফোর্ড মেডিকেল স্কুল জার্নাল, উইকিপিডিয়া এবং গুগলের অন্যান্য এক্সপার্ট মামামামীরা।


শিরোনামহীন সিরিজ-৫

  আমাদের মেয়েদের কপালে আঁকা চাঁদ সূর্য  আমাদের গালে গোধূলি আলো আমাদের গ্রহণের কাল ফুরসত পেলেই পাত পেতে বসে সারাদিন এই সমস্ত জঙ্গল পেরোতে পের...