শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

Book Review of Haruki Murakami's Novella 'Hear the wind sing'

 

মাত্র দুটি বই পড়ে বিশ্বখ্যাত একজন লেখককে অনুভব করতে পারা কঠিন শুধু নয় প্রায় অসম্ভব। তাই সে চেষ্টা আমি একেবারেই করব না। হারুকি মুরাকামির মত লেখক যার গল্পের ভেতরে গল্প তার ভেতরে গল্প....সে সব গল্পেরও আবার নানারকম বাঁক এবং বাস্তবতা। এরকম সাহিত্যকর্ম এবং তার স্রষ্টাকে বুঝতে পারা সহজ নয় (আমার মত অতিরিক্ত সাধারণ পাঠকের পক্ষে!)। নরওয়েজিয়ান উড যখন পড়েছি তখন একটা ধাক্কার মত খেয়েছিলাম। মূল গল্পের ভেতরের গল্প গুলো ছিল একেবারেই অচেনা। যেটা বুঝতে পারছিলাম তার গল্পে বিষণ্ণতা একদম মৃত্যুর মত শীতল। প্রতিটি চরিত্র ভয়ানক একাকিত্বে একাকার অথচ প্রাত্যহিক জীবন যাপন খুব স্বাভাবিক। অন্তত খোলা চোখে তাই দেখা যায়। 

 নরওয়েজিয়ান উডের পর আর মুরাকামি পড়া হয়নি। দীর্ঘ বিরতি শুধু মুরাকামি পড়ায় নয় সামগ্রিক বই পড়াতেই ছিল। যেন গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলাম। কবিতা লিখেছি অল্পবিস্তর আর পাগলের মত শয়ে শয়ে কবিতা পড়েছি। কাজের বাইরের সময়টা ফেসবুকের নানান গ্রুপে উপস্থিতির সাড়া দিয়ে বেড়ানো ছাড়া আর কিছু করেছি বলে মনে পড়ে না। তারপর অনেক অনেক দিন বাদে আবার কেন জানি পাঠক সত্ত্বা জেগে উঠল এবং একের পর এক বই পড়া শুরু করে দিলাম। অবশেষে আমার ফেসবুকের কর্মকাণ্ড সীমিত করা গেল! এখন এখানে লিখতেও ভাল্লাগে না পড়তেও না। এরচেয়ে বই পড়া ভালো লাগে। আর আমার দিন রাত এখন এভাবেই যায়। বই পড়া আর মিউজিক শোনা। লিখতে এখন আর আমাকে দেখা যায় না বললেই চলে!

 (অবশ্য মনে রাখতে হবে দীর্ঘ বিরতি মানেই শেষ বিরতি নয়। লেখালেখি আমার রক্তে বহমান। একভাবে না একভাবে লিখবই। তাই খুব বেশি ভাবি না। এখন লিখি না কিন্তু লিখব। আজ কিংবা কাল। তবে লিখব যে সেটা সুনিশ্চিত!)

সে যাকগে। হারুকি প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এই উপন্যাস পড়ার আগে একটু হারুকিকে পড়ে নেয়া দরকার বলে মনে করেছি। তো সেইজন্য গুগলে সার্চ দিয়ে যা সামনে পেলাম পড়ে ফেললাম। এই যেমন -

হারুকি মুরাকামি জন্মেছেন জাপানের কিয়েটোতে। তার বাবা একজন জাপানি সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। পিতামহ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তিনি তার কৈশোর কাটিয়েছেন কোবে নামক বন্দর শহরে। যে শহরের আকাশে বাতাসে জ্যাজ মিউজিক বাজত। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গীতকে সাথে করে নিয়ে যাওয়া হাজারো নাবিক এবং পর্যটক কিশোর হারুকি মুরাকামির জীবনকে একজন প্রকৃত সঙ্গীত প্রেমিক করে দিতে পেরেছিল।  নাবিকদের বিক্রি করা নানান বই খুব সস্তায় পুরোনো বইয়ের দোকানে পাওয়া যেত তখন। আর সেসব বই তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় ইংরেজি ভাষার সাথে এবং ইংরেজি ভাষায় লেখায় সাহিত্যকর্মের সাথে। বিশ্বসাহিত্য এবং সঙ্গীতকে তিনি এমনভাবে বুকে ধারণ করেছেন যে তার সারাজীবনের লেখালেখি এর প্রভাববলয় থেকে আর বের হতে পারেনি। সেজন্যই হয়ত তার অনুবাদকর্মের সূচনা। বিশ্বসাহিত্যের অনেক নামকরা বই জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন নিজের মৌলিক লেখার পাশাপাশি। 

জাপানি সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে তার সাহিত্যকর্ম অনেকটা অনুবাদ গল্পের মত। সেখানে জাপান অনুপস্থিত। সকল গল্পের পটভূমি জাপানে হলেও জাপানি সংস্কৃতিকে তেমন দেখা যায় না বলে তাদের মতামত। বরং এক বিচিত্রতা পরিলক্ষিত হয়। পরাবাস্তবতা, কাল্পনিক ঘটনাবলী এবং মানুষের অবচেতন মনের ভেতরের বিচিত্র সব প্রাণীদের নানান কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যায়! তিনি এক চিরন্তন বিষণ্ণতার জগত নির্মাণ করেন তার গল্পে। মৃত্যু এবং অন্তহীন নিস্তব্ধ নিঃসঙ্গতা পাঠককে এমন এক দেয়ালের মুখোমুখি করে দেয় যার ব্যপ্তি এবং উচ্চতা অজানা। 

 তিনি প্রতি দশ বছর অন্তর অন্তর তাঁর লেখার প্যাটার্ন চেঞ্জ করেন যা তাঁকে একনিষ্ঠভাবে লেখালেখি চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা যোগায়। হারুকি মুরাকামি অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং যত্নশীল একজন লেখক। কোন উপন্যাস অথবা গল্প প্রকাশের আগে তিনি এতবার রিভিউ করেন যে সেটা প্রকাশনা সংস্থায় যাবার পর প্রুফ রিড করার কোন সুযোগ থাকে না! 

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ করেন। এখনও তিনি রাত ৯টায় ঘুমোতে যান। ভোর চারটায় উঠেন। একটানা লেখেন ৫/৬ ঘন্টা এবং প্রতিদিন দৌড়ান। কখনো বা সাঁতার কাটেন। ভোরের প্রকৃতি, গাছ, পাখি, সঙ্গীত তাঁকে ভীষণরকম  উজ্জীবিত করে। তিনি বলেন লেখালেখির জন্য তার এইরকম ডিসিপ্লিনড জীবনযাপন জরুরি।  

লেখালেখি শুরু করার আগের কয়েক বছর তিনি এবং তাঁর  স্ত্রী ইয়োকো মুরাকামি টোকিওতে একটি জ্যাজ ক্লাব চালাতেন। ২৯ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস 'হিয়ার দ্য উইন্ড সিং' লেখেন ১৯৭৮ এ। বইটি তিনি লেখেন তার রান্নাঘরের টেবলে বসে। তখন হারুকির ছিল প্রচন্ড খাটুনির জীবন। স্বামী স্ত্রী দুজন মিলে চালাতেন ক্লাবটা। প্রচন্ড পরিশ্রম করে ক্লাবটাকে তাঁরা দাঁড় করিয়েছিল। তো এই রকম সারাদিন ক্লাবে খাবার পানীয় বানিয়ে লোকজনকে পরিবেশন করে অবসর মিলত সেই একেবারে রাতে এবং এই সমস্ত কাজের ফাঁকে ফাঁকেই তিনি লিখে গেছেন। চার মাস মত সময় লেগেছে তার ভাবনাকে উপন্যাসে রুপ দিতে। এটি একটি ছোট উপন্যাস বা নভেলা। বইটি প্রকাশিত হবার দেড় বছর পরে 'Gunzu Literature Prize' পান যা তাকে একাধারে বিস্মিত এবং অনুপ্রাণিত করে লেখক জীবন শুরু করার জন্য। 

এবার মূল উপন্যাসে আসি। গল্পের নায়ক সামারের ছুটিতে তার জন্মশহর কোবে'তে অলস সময় কাটাচ্ছিল প্রিয় বন্ধু র‍্যাটের সাথে। তারা প্রতিদিন জে'র বারে বসে বিয়ার খেত এবং একটার পর একটা খেতেই থাকত (অবসেশন!)। র‍্যাট এক আজব ছেলে যার পড়াশোনা ভালো লাগে না। নিজে ধনী ঘরের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ধনীদের সে প্রবল ঘৃণা করত। অঢেল সম্পদ এবং কোন কিছু না করেও জীবন কাটিয়ে দেয়ার নিশ্চয়তাকে তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ বিষয়ের একটি মনে হত। এই গল্পের পাত্র পাত্রী এবং ঘটনাপ্রবাহ খুবই সীমিত (যেহেতু গল্পটি মাত্র ১৯ দিনের ঘটনাপ্রবাহ কেন্দ্রিক)। র‍্যাট, চায়নিজ বারটেন্ডার জে, নয় আঙুলের মেয়েটি, অতীতের মানুষেরা, কিছু চলমান গল্প, আগস্ট মাসের অসহ্য গরম আর গল্পের ভেতরের নানান গল্প। 

যেমন আমেরিকান কল্পকাহিনী লেখক ডেরেক হার্টফিল্ডের একটি গল্প (এই নামে কোন লেখক নেই বাস্তবে। গল্পটি মুলতঃ তিনিই লিখেছেন!) হারুকি বইয়ে উল্লেখ করেছেন। গল্পটা এরকম- 

একজন মহাকাশ পরিব্রাজক গেলেন মঙ্গলের অন্তহীন কুয়াগুলো দেখতে। কেননা খবরে বলা হচ্ছে লোকজন সেসব কুয়ায় যেয়ে আর ফেরত আসেনি। গল্পের নায়ক অসীম সাহসী এবং কৌতুহলী। আত্মহত্যা করার আগে সে ভাবল দেখাই যাক না কি আছে এসব কুয়ায়। তো সে কুয়ায় নামল এবং কুয়ার নিচে একটি সুরঙ্গ পথ আবিষ্কার করল। সেই পথের শেষ কোথায় দেখার জন্য সে হাঁটতে শুরু করল এবং অনুভব করতে শুরু করল কিছু একটা যেন তার ভেতরে পরিবর্তন ঘটে গেছে। নিজেকে বেশ উৎফুল্ল লাগল তার কাছে। এবং সে হাঁটতে থাকল। হাঁটতে হাঁটতে যুবকটি লক্ষ্য করল সে আর একটি কুয়ার তলায় এসে পৌঁছেছে এবং আবারও একটি সুরঙ্গ পথ। এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে একদিন সে আলোর দেখা পেল। সুরঙ্গ পথ দিয়ে মঙ্গলের অপর প্রান্তের এক কুয়ো থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে যুবকটি অবাক হয়ে ভাবল, 'এ কোথায় এলাম!' কিছুই বোধগম্য হ'ল না তার। হঠাৎই কে যেন কানে কানে বলল, সূর্যটা আর দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার বছর পরে বিস্ফোরিত হবে। যুবকের মনের ভেতরে এক ভয়াবহ হাহাকার তৈরি হয় এই কথায়। বাকিটা আর বলছি না। এটুকু পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়ে নেবেন। 

এই গল্পটা খুব সহজ সাবলীল ভাষায় বাংলায় অনুবাদ করেছেন চলচিত্র নির্মাতা, লেখক, অনুবাদক আলভী আহমেদ। এটা যে অনুবাদ বই একবারও মনে হয়নি। এত ভালো অনুবাদ হয়েছে। তার আরও বই পড়ার ইচ্ছা রাখি।

এই তো। আর কিছু বলার নাই। যারা পড়তে চান বইটি কিনে পড়ে নিয়েন। ভাল্লাগবে আশা করি। আমার তো বেশ ভালো লেগেছে বইটা। 

০১/০৯/২১


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনামহীন সিরিজ-৫

  আমাদের মেয়েদের কপালে আঁকা চাঁদ সূর্য  আমাদের গালে গোধূলি আলো আমাদের গ্রহণের কাল ফুরসত পেলেই পাত পেতে বসে সারাদিন এই সমস্ত জঙ্গল পেরোতে পের...